সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

প্রতিবাদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে জাতীয় কবি বিষয়ক অধ্যয়ন সঙ্কুচিত করন

দৈনিক প্রথম আলো ২৫ শে মে ২০১২ সংখ্যায় প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী জানতে পারলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সম্মান কোর্সের জন্য তৈরি করা নতুন পাঠক্রমের মোট তিন হাজার নম্বর এর মধ্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিষয়ক অধ্যয়নের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ১৬ দশমিক ৪ নম্বর! এর আগের পাঠক্রমে নজরুল অধ্যয়নের জন্য মোট নম্বর ছিল প্রায় পঞ্চাশ। এটা শুধু আমাদের জাতীয় কবির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনই নয়; আমাদের জাতীয় চেতনাকে দুর্বল এবং ভোঁতা করে দেয়ার এক আত্মঘাতী সিদ্ধান্তও বটে। প্রথমত সাহিত্য মান বিচারে নজরুল বাংলা সাহিত্যই শুধু নয়, বিশ্ব সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি, তাই এরকম একজন মহান সাহিত্যিকের রচনার ভাণ্ডার থেকে এদেশের ভাবী সাহিত্যিকদের বঞ্চিত করাটা আর যাই হোক যুক্তিযুক্ত নয়। দ্বিতীয়ত নজরুল এর কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ এর মূল সূরই হচ্ছে শোষণ-বঞ্ছনা; সামাজিক বৈষম্য সহ সকল প্রকার অনাচার এবং অবিচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা; বাংলা সাহিত্যের শান্ত-সুস্থির এবং স্থবির চেতনায় নজরুলই ঢেলে দিয়েছেন প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের বিপ্লবী বিষবাস্প। বাংলা সাহিত্যের আমূল এবং বৈপ্লবিক পরিবর্তনের এই মহান নায়ক বাংলা সাহিত্যকে যেভাবে গণমানুষের কাতারে নিয়ে এসেছেন আর কোন কবি কিংবা সাহিত্যিক তা পারেননি; বাংলা সাহিত্য যেখানে ছিল সমাজপতি, রাজন্যবর্গ এবং সমাজের তথাকথিত উঁচুশ্রেণীর জীবন চেতনার আলেখ্য; সেখানে নজরুলই সাহিত্যের পাতায় স্থান দিয়েছেন গণমানুষের চাওয়া–পাওয়া; আনন্দ-বেদনা; সুখদুঃখ; তাদের প্রতিবাদ, বিক্ষোভকে। নজরুলই সাহিত্যকে রাজসিংহাসন থেকে টেনে নিয়ে এসেছেন জনতা কাতারে। এই নজরুলই পুরো ভারতবর্ষের প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন তার ধুমকেতু পত্রিকার সম্পাদকীয়তে; এটাই সত্য যে কোন রাজনীতিবিদ নয়, একজন বিদ্রোহী কবি ব্রিটিশ শাসিত ভারতের স্বাধীনতার ডাক দিয়ে কারাবরণ করেছেন। অর্থাৎ নজরুল আমাদের চেতনাকে শাণিত করেছেন; আমাদেরকে উদ্বুদ্ধ করেছেন স্বাধিকার আদায়ের সংগ্রামে; সাম্রাজ্যবাদ এবং উপনিবেশিক শোষণ নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রেরণা আমরা পাই তার লেখনী থেকে; এরকম একজন মহান সাহিত্যিকের রচনা অধ্যয়নের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে মাত্র ১৬ দশমিক ৪ নম্বর অথচ এর আগের পাঠক্রমে নজরুল অধ্যয়নের জন্য মোট নম্বর ছিল প্রায় ৫০! আমরা মনে করি এ ধরনের হঠকারী সিদ্ধান্ত আমাদের জাতীয় কবির প্রতি অবমাননা প্রদর্শনই শুধু নয়, আমাদের তরুণ প্রজন্মকে চেতনাহীন করার এক গভীর চক্রান্তের প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়; নতুন প্রজন্মকে নজরুলের সাহিত্য অধ্যয়ন থেকে বঞ্ছিত করা মানে হচ্ছে তাদেরকে সাম্রাজ্যবাদ; নয়া উপনিবেশবাদ এবং বৈশ্বিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার প্রেরণা থেকে বঞ্চিত করা; নজরুলের সাহিত্য অধ্যয়ন থেকে বঞ্ছিত করা মানে হচ্ছে তরুণ প্রজন্মকে সামাজিক শোষণ-নিপীড়ন এবং বৈষম্য এর বিরুদ্ধে প্রতিবাদী চেতনা ধারণ করা থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা... আমাদের সীমান্তে আজ চলছে ভারতীয় বাহিনীর আগ্রাসন; সাগরের তেল গ্যাস এবং বন্দর দখল করতে মরিয়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি; দেশের খনিজ সম্পদ লুট করার চেষ্টায়রত বহুজাতিক কোম্পানি শেভ্রন; কনকোফিলিপ্স, অক্সিদেন্তাল, সান্তোস, কেয়ারন্স, তাল্লো। দেশের রাজনীতিকে এবং রাজনৈতিক দলগুলোকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর সম্পূর্ণ করায়ত্তে নিয়ে এসে এদেশকে নয়া উপনিবেশ বানানোর চক্রান্ত আজ অত্যন্ত সুস্পষ্ট। এই অবস্থায় দরকার নজরুল এর সাহিত্য চেতনার বিকাশ যাতে করে তরুণ প্রজন্ম সাম্রাজ্যবাদ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে পারে এবং তার মধ্য দিয়ে নিশ্চিত করতে পারে জাতীয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। বাংলাদেশের বর্তমান আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নজরুল চর্চা যেখানে আরও বাড়ানো দরকার সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের নতুন পাঠক্রমে তাকে সঙ্কুচিত করা কোন ভাবেই মেনে নেয়া যায় না; আমরা জানি না নজরুলের সাহিত্যের প্রতি এসব তথাকথিত অধ্যাপকদের এত বিরাগ কেন? আমরা জানি না কার স্বার্থে তারা এই হীন কাজটি সম্পাদন করলেন? আমরা মনে করি নজরুল এর সাহিত্যের প্রতি তাদেরই বিরাগ থাকতে পারে যারা মনে প্রাণে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রতি দায়বদ্ধ এবং তাদের সেবাদাস হিসেবে যারা কাজ করতে কুণ্ঠাবোধ করেন না এবং নয়া উপনিবেশিক শোষণ-নিপীড়ন কে যারা বুদ্ধিবৃত্তিক বৈধতা দেয়ার কাজে লিপ্ত। আমরা এহেন গর্হিত কাজের তীব্র নিন্দা এবং প্রতিবাদ জানাই। দেশের সকল মহল থেকে এ ধরণের অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আশা করছি। আমাদের দাবিসমূহ: - অতিদ্রুত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের কাছে আমরা এই পাঠক্রমের সংশোধনের দাবি জানাচ্ছি। যেখানে আগের পাঠক্রমে মোট নম্বর ছিল প্রায় ৫০; যেখানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলার পাঠক্রমে নজরুল অধ্যয়ন বিষয়ে নম্বর ৫০ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি কোর্সের জন্য ১০০ নম্বর করে বরাদ্দ আছে সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা পাঠক্রমে তা আরও বাড়ানোর দাবী জানাই। - পাঠক্রমে নজরুল অধ্যয়ন সঙ্কুচিত করা এবং নজরুল কে উপেক্ষা করার প্রেক্ষিতে একটা তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্যের কাছে আবেদন জানাচ্ছি এবং এক্ষেত্রে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবী করছি। - এ ব্যাপারে প্রতিবাদী ভূমিকা পালনের জন্য নজরুল ইনস্টিটিউট এর কাছে আকুল আবেদন জানাচ্ছি। - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকদের প্রতি এ ধরণের অন্যায় কাজের প্রতিবাদ করার আহবান জানাচ্ছি। : যোবায়ের আল মাহমুদ, প্রভাষক, ফার্মেসী অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

bidrohi, institute, bangla-department, dhaka-university, education, nazrul